গণপূর্ত অধিদপ্তর বাংলাদেশ সরকারের নির্মাণ সংস্থার পথিকৃত এবং সরকারি প্রকল্পের ভবন নির্মাণে ভরসার স্থল। সরকারের নির্মাণ সংস্থার পাশাপাশি দেশের নির্মাণ শিল্পের গতি, মান ও কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে থাকে। এই বিভাগ টার্নকির ভিত্তিতে প্রকল্প সম্পন্ন করে যেমন: পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন, অভ্যন্তরীণ সড়ক, বিদ্যুতায়ন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নি নির্বাপণ,আরবরিকালচার ইত্যাদি। ভবন নির্মাণ প্রকল্পের ধারণা থেকে সম্পন্ন করা পর্যন্ত স্থাপত্য বিভাগের সহায়তায় এটি পরামর্শ সেবাও প্রদান করে থাকে। ভবন নির্মাণের সকল বিষয়ে দক্ষ পরামর্শ সেবা এখানে পাওয়া যায়।

গণপূর্ত অধিদপ্তর তার দেশব্যাপী অফিস কার্যক্রমের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ ক্ষেত্রে সকল উঠতি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম। এর সুযোগ্য, প্রশিক্ষিত এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাহিনী দেশের একাধিক জটিল প্রকল্প সম্পন্ন করে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। এই ২১ শতকে আমরা আইসিটির অগ্রযাত্রা থেকে নিজেদের গুটিয়ে রাখতে পারিনা, কারণ আইসিটি হলো আধুনিক ব্যবস্থা যাতে ই-গভর্নেন্সের ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি কাজে স্বচ্ছতা, দক্ষতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। তাই গণপূর্ত অধিদপ্তরের আইসিটি উন্নয়ন আমার কর্ম তালিকায় অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এই সূত্রে কিছু ডাটাবেজ সফটওয়্যার উন্নয়নের সূচনা হতে যাচ্ছে। আমি আমার সহকর্মীদের অনুরোধ করছি তারা যেন কম্পিউটারে বিশেষ করে ডাটাবেজ সফটওয়্যার ব্যবহারে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে।

তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে সংস্থাগুলো তাদের আইসিটি সেবা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্টেকহোল্ডারদের কাছে পৌছে দিচ্ছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর  ২০০২ সাল থেকে তার ওয়েবসাইট পরিচালনা করে আসছে। আমার পর্যবেক্ষণ হলো এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নাগরিকরা এই অধিদপ্তর সম্পর্কে জানতে পারবে। এজন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের সিটিজেন চার্টার ওয়েবসাইটে রাখা আছে এবং আমি আশা করি এটি স্টেকহোল্ডারদের উন্নততর সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করবে। আমি চাই এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ক্লায়েন্ট মন্ত্রণালয়সমূহ আমাদের ডাটাবেজ সিস্টেমে সংযোগ স্থাপন করে তাদের বিভিন্ন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। আমি আরো আশা করি এই কাজের সাথে জড়িত কর্মকর্তারা এই ওয়েবসাইটটির নিয়মিত আপডেট অব্যাহত রাখবেন।

সুযোগ্য, প্রশিক্ষিত এবং নিবেদিতপ্রাণ কর্মী বাহিনী প্রকল্প সম্পন্ন করে সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ

 

আরিফুর রহমান ।।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে গত বছরের সেপ্টেম্বরে যুবলীগ নেতা জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিকে বিল্ডার্স তাদের চলমান ১৭টি প্রকল্পের সব কটির কাজ বন্ধ করে দেয়। প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়া সরকারের সংস্থা বারবার তাগাদা দিলেও তারা আর কাজে নামেনি। একটা পর্যায়ে এসে সরকার সব প্রকল্পের চুক্তি বাতিল করে নিয়মানুযায়ী অন্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ শেষ করার প্রক্রিয়া শুরু করে। কিন্তু জিকে বিল্ডার্স কাজ এগিয়ে না রাখায় ১৭টি প্রকল্পের বেশির ভাগেরই ব্যয় ১০ থেকে ২০ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে। দু-একটা প্রতিষ্ঠানে অবশ্য ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কাজ হয়ে যাওয়ায় ব্যয় তেমনভাবে বাড়বে না।

এদিকে চুক্তি বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত জিকে বিল্ডার্স ১৭টি প্রকল্পে যতটুকু কাজ করেছে, সেই কাজ পরিমাপ করে টাকা পরিশোধ করতে যতটা তোড়জোড় দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পগুলোর কাজ বন্ধ থাকায় সরকারের যে ক্ষতি হয়েছে, সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ে কোনো তৎপরতা নেই গণপূর্ত অধিদপ্তরের। একটি প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে পরিমাপ করে সব টাকাই জিকে বিল্ডার্সকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে। কিভাবে ওই কাজের পরিমাপ করা যায়, তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ২০১৪ সালের রেট শিডিউলে (দাম প্রস্তাবে) যেসব প্রকল্পে কাজ পেয়েছিল জিকে বিল্ডার্স, সেসব প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে ১০ থেকে ২০ শতাংশ। আবার প্রকল্পের মেয়াদও বাড়ছে এক থেকে দুই বছর। আর নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়া থেকে পিছিয়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন জনগণ সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে সরকারকেও বাড়তি টাকা গুনতে হবে।

কাজ বন্ধ থাকার কারণে প্রকল্পে বাড়তি যে টাকা খরচ হবে, জিকে বিল্ডার্স থেকে সেই টাকা আদায়ের কোনো জোরালো তৎপরতা নেই। যদিও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি প্রকল্পের বিপরীতে ‘সিকিউরিটি মানি’ রাখা আছে। সেখান থেকে পরবর্তী সময়ে কেটে রাখা হবে। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘সিকিউরিটি মানি’ যেটা রাখা আছে, প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে তার চেয়েও বেশি। সে ক্ষেত্রে দিন শেষে সরকারকেই এই টাকা গুনতে হবে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে এক বছর কাজ বন্ধ থাকায় কিভাবে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে তার একটি উদাহরণ হলো রাজধানীর শেরেবাংলানগরে নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের পাশে ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট আরেকটি হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি। দুই বছর আগে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় যখন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়, তখন এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪২০ কোটি টাকা। ১২ তলাবিশিষ্ট হাসপাতাল ভবনটি নির্মাণের কাজ পায় জিকে বিল্ডার্স। গত বছর ২০ সেপ্টেম্বর জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার তিন দিন পর কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। জিকে বিল্ডার্স কাজটি করছিল গণপূর্ত অধিদপ্তরের ২০১৪ সালের রেট শিডিউলের আলোকে। এখন চলছে ২০১৮-এর রেট শিডিউল। নতুন করে প্রকল্পটির খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৬০ কোটি টাকা। অর্থাৎ খরচ বেড়েছে ৪০ কোটি টাকা, যা প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি। আর প্রকল্পের মেয়াদ বেড়েছে দুই বছর। জিকে বিল্ডার্সের গাফিলতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রকল্পের এই ব্যয় বাড়লেও বাড়তি টাকা জনগণের দেওয়া কর থেকে বা রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘কন্ডিশন অব কন্ট্রাক্ট’ বা চুক্তিপত্রের শর্তাবলিতে স্পষ্ট লেখা আছে, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হলে বাড়তি যে টাকা খরচ হবে, সেই টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে।’

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে জিকে বিল্ডার্সের যে ৩০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলা হচ্ছে, এই খরচ নির্ধারণ হলো কিভাবে? এখানে কি বুয়েটসহ কারিগরি বিশেষজ্ঞ কেউ উপস্থিত ছিলেন? ম্যাজিস্ট্রেট, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তার সমন্বয়ে যে খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে, এটা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, জিকে বিল্ডার্স ১০ মাস কাজ বন্ধ করে সরকারের যে সময় নষ্ট করেছে, সরকার চাইলে সে জন্য প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারে। তা ছাড়া যে সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ হওয়ার কথা, কিন্তু প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে হয়নি, এখন প্রকল্পে বাড়তি যে টাকা খরচ হবে সরকার চাইলে সেই ক্ষতিপূরণ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে নিতে পারবে। কারণ ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিপত্রে তা স্পষ্ট করে বলা আছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খায়রুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সিকিউরিটি মানি রাখা আছে। সেখান থেকে নেওয়া যাবে।’

সরকারের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, জিকে বিল্ডার্স নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের মূল ভবনের মাটি খনন কাজ শুরু করে ড্রেসিং লেভেল পর্যন্ত ২০ ফুট মাটি কাটার কাজ শেষ করে। বেজমেন্টের ম্যাটের ৩০ শতাংশ ঢালাই কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর গণপূর্ত অধিদপ্তর পুনরায় দরপত্র প্রক্রিয়ায় যেতে জিকে বিল্ডার্স কতটুকু কাজ করেছে তা পরিমাপের জন্য একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা, প্রশাসন ক্যাডারের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান—এই তিন প্রতিনিধি যাচাই-বাছাই করে দেখেছে এই প্রকল্পে ৩০ কোটি টাকার কাজ হয়েছে এবং সব টাকাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়েছে।

একাধিক ক্রয়বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ ধরনের কাজে যখন পরিমাপ করা হয়, সেখানে প্রকৌশলী নিয়োগ দিতে হয়। কারিগরি ব্যক্তি নিয়োগ দিতে হয়।

স্বাস্থ্যসচিব আব্দুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জি কে শামীমের সঙ্গে সব প্রকল্পে চুক্তি বাতিল হয়েছে। এর পরও যদি কোনো অনিয়ম হয়, আপনি লেখেন। অনিয়ম যদি সত্যি হয়, আমরা ব্যবস্থা নেব।’

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ডা. বদরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রায় এক বছর ধরে আমাদের হাসপাতাল নির্মাণের কাজটি বন্ধ। জিকে বিল্ডার্সকে তিনবার নোটিশ দেওয়া হয়। তার পরও তারা কাজ করেনি। এই কারণে প্রকল্পের খরচ ৪০ কোটি টাকা বেড়ে গেছে। মেয়াদও বেড়েছে আরো দুই বছর।’ তিনি বলেন, এই প্রকল্পে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকার মতো সিকিউরিটি মানি রাখা আছে। সরকার চাইলে বাড়তি যে টাকা খরচ হচ্ছে, সেখান থেকে কেটে রাখতে পারে।

গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, জিকে বিল্ডার্স সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ১৭টি প্রকল্পের কাজ পেয়েছে এককভাবে। যেগুলোর আর্থিক মূল্য এক হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প হলো ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা নির্মাণ, বেইলি রোডের চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টস কমপ্লেক্স ভবনে চেয়ারম্যানের বাসভবন, ডরমিটরি, প্রশাসনিক ভবন ও হল নির্মাণ, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের অফিস ভবন নির্মাণ, সচিবালয়ের ২০ তলা ভবনের স্যানিটারি ও বৈদ্যুতিক কাজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের বর্ধিতকরণ কাজ, আজিমপুর কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাট নির্মাণ, সচিবালয়ের ২০ তলা ভবনের কাজ, শেরেবাংলানগরে নিটোরে বাউন্ডারি ওয়াল ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ, র‌্যাব সদর দপ্তর কমপ্লেক্সের কাজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালের কাজ, এনবিআর ভবনের কাজ এবং মহাখালীর অ্যাজমা সেন্টারের কাজ।

অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জিকে বিল্ডার্সের পাওয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত কাজ হয় ৩৫ শতাংশ। আর আর্থিক খরচ হয় ২৯ শতাংশ। এই প্রকল্পের পুনঃ দরপত্র আহ্বানের জন্য কতটুকু কাজ হয়েছে, তা পরিমাপ করে ঠিকাদারের টাকা পরিশোধ করতে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য বলছে, প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে যাচ্ছে।

চট্টগ্রাম হিলট্র্যাক্টস কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ প্রকল্পটির কাজ বন্ধ হওয়ার আগে ভৌত কাজ হয়েছে ৭৫ শতাংশ। আর আর্থিক খরচ হয়েছে ৫৬ শতাংশ। এই প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে। আজিমপুর কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তাদের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটির ভৌত কাজ শূন্য। আর্থিক কাজও শূন্য। ফলে এই প্রকল্পেও ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে মেয়াদও। উত্তরায় র‌্যাব সদর দপ্তর কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণের ভৌত অগ্রগতি মাত্র ৭ শতাংশ। আর আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৬ শতাংশ। ফলে এই প্রকল্পেও ব্যয় ও মেয়াদ দুটিই বাড়ছে।

এদিকে জি কে শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আজিমপুর সরকারি কলোনিতে বহুতল ভবন নির্মাণের চুক্তি বাতিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে করা রিট উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করেছেন হাইকোর্ট। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি এসব প্রকল্পে আর কাজ পাবে না। কারণ তিনবার নোটিশ দেওয়া, ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগসহ সব প্রক্রিয়া অবলম্বন করেই চুক্তি বাতিল করা হয়েছে।

 

সুত্র: কালের কন্ঠ

জি কে শামীমের ১৭ প্রকল্প : ক্ষতিপূরণ আদায়ের বদলে বিল দিতে উৎসাহী গণপূর্ত

 

ফয়সাল হোসেন।

একযুগের বেশি সময় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পূর্ত অধিদপ্তরের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে মাঠপর্যায় থেকে অফিসিয়াল কাজ সম্পন্ন করতেন। মাস শেষে প্রতিষ্ঠানের বেতন দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলতো।

কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় স্বপ্ন জেঁকে বসে স্বল্প সময়ে কোটিপতি হওয়ার। ফলে ধীরে ধীরে নিজেই ঠিকাদারি লাইসেন্স করেন। অনেক আশা বুকে নিয়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গত তিন বছরে ইজিপি টেন্ডারে অংশ নিয়ে ২০ লাখ টাকা খুইয়েছেন।

তার মতে, সরকারের কাজে গতিশীল ও দুর্নীতি বন্ধে ইজিপি পদ্ধতি চালু করলেও সেখানে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। বরং আগে যেসব ঠিকাদার ও কর্মকর্তা টেন্ডারে অনিয়ম করেছেন, তাদের কাছে এটি নতুন কৌশল মাত্র। ইজিপিতে অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে কোনো প্রকৌশলী প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে নারাজ। কারণ তারা মনে করছেন, সরকারের এই নতুন পদ্ধতির অনিয়ম সম্পর্কে কথা বললে তাদের সমস্যা হতে পারে।

জানা গেছে, ইজিপি চালু করতে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ইজিপি নীতিমালা করা হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬-এর ৬৫ ধারা অনুযায়ী এ নীতিমালা করা হয়। নীতিমালার ভিত্তিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রিফর্ম প্রজেক্ট-২ এর অধীনে কেন্দ্রীয় ইজিপি পোর্টাল তৈরি করে সিপিটিইউ। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। দরপত্র আহ্বানে ইজিপি পদ্ধতিতে পুঞ্জীভূত দুর্নীতি নতুনভাবে রূপ নিয়েছে। দ্বিগুণ বেড়েছে দরপত্র জালিয়াতি।

অনলাইনে সরকারি কেনাকাটার (ইজিপি) কার্যক্রম পরিচালনাকারী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) কোনোভাবেই এই জালিয়াতি রোধ করতে পারছে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকৌশল সংস্থা।

এই সংস্থার তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহমিনা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মাদ হানিফ  বলেন, সরকার দুর্নীতি ও আধিপত্য বিস্তার দূর করতে ইজিপি পদ্ধতি চালু করে। কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতিতে সংস্থার কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ঠিকাদাররা দুর্নীতি করছেন।

প্রধান কার্যলায় থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত প্রতি স্তরেই ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। টেন্ডারবাণিজ্য বন্ধে সরকার ইজিপি পদ্ধতি চালু করলেও বন্ধ হয়নি এই খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করতে না পারলে কাজ পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রাক্কলন মূল্য প্রকৌশলী জানান শুধু তার পছন্দের ঠিকাদারকেই। এ ছাড়াও অনেক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নিজের আত্মীয় স্বজনকে দিয়ে ঠিকাদারি কাজ করানোরও অভিযোগ আছে।

সিপিটিইউ সূত্রে জানা গেছে, ইজিপি পদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকে এ ব্যবস্থায় সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বড়েছে কয়েক গুণ। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অধিদপ্তরসহ অধিকাংশ উন্নয়ন, সংস্কার ও কেনাকাটা সরকার ইজিপি ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। বর্তমানে ৪৭টি মন্ত্রণালয়, ২৭টি বিভাগ এবং এক হাজার ২৯২টি প্রতিষ্ঠান ইজিপিতে নিবন্ধন করেছে। আর ২০১২ সালের জুনে ছিলো ১৪।

২০১৩ সালের জুনে ৪৯৮, ২০১৪ সালে জুনে আট হাজার ৪৩৬ ও ২০১৫ সালের জুনে ২৬ হাজার ১০২টি ছিলো। এভাবে প্রতিবছর আহ্বানকৃত দরপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে আর্থিক সংশ্লষ্টতা। কিন্তু দরপত্র নিষ্পন্নকালে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ অনুযায়ী, ঠিকাদারদের কারিগরি ও আর্থিক যোগ্যতা যাচাই করার ক্ষেত্রে চরম শৈথিল্য দেখানো হচ্ছে।

এতে অযোগ্য অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে যাচ্ছে; যা পরবর্তীতে কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ে কাজই শেষ করতে পারে না। ফলে বেড়ে যায় প্রকল্প ব্যয়। এসব প্রকল্প একদিকে যেমন সরকারকে সমালোচনার মুখোমুখি করছে, অন্যদিকে বৃদ্ধ করছে জনভোগান্তি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারের সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় কারিগরি এবং আর্থিক যোগ্যতা আছে কি-না দরপত্র নিষ্পন্নকালে তা যাচাই করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু কর্মকর্তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ঠিকাদারের যোগ্যতা আছে কি-না তা যাচাই করছেন না। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সিপিটিইউ সমপ্রতি একটি পরিপত্র জারি করে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, পিপিএ-২০০৬ এর ৪৮ ধারার অধীন দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে ধারা ৫০ অনুযায়ী দরপত্র দলিলে উল্লিখিত দরপত্র দাখিলের পর রেসপন্সিভ দরপত্রদাতার কার্যকরভাবে চুক্তি পালনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও আর্থিক সামর্থ্য আছে কি-না তা যাচাই করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সমপ্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এই বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে না।

এতে আরো বলা হয়, পিপিআর-২০০৮ এর ১০০(১) ধারা মতে, দরপত্র দলিলে উল্লিখিত নির্ণায়ক অনুসরণক্রমে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি দরপত্র দাখিল-উত্তর যোগ্যতা যাচাই করবে।

ধারা-২ মতে, মূল্যায়ন কমিটি প্রয়োজনে দরপত্রদাতা কর্তৃক দরপত্র দলিলে প্রদত্ত ক্রয় কার্যাদি সম্পাদন সম্পর্কিত তার অতীত অভিজ্ঞতার বিবরণ যাচাই করার জন্য এবং সংশ্লিষ্ট দরদাতা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্যাদি সংগ্রহকল্পে সূত্রের সাথে যোগাযোগ করবে।

ধারা-৩ মতে, যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যথাযথ বলে বিবেচিত হলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বিশেষভাবে উচ্চমূল্য বা জটিল কার্যে দরপত্র মূল্যায়নের সময় টেন্ডার দলিলে বর্ণিত তথ্যের সঠিকতা যাচাই করার জন্য দরদাতার কার্যালয় বা ভবন পরিদর্শন করতে পারবে।

৪-এর উপবিধি-৩ মতে, পরিদর্শনে সাধারণভাবে দরপত্রদাতার যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা সংক্রান্ত বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা প্রত্যক্ষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। পরিদর্শনের সময় দরপত্রদাতার সাথে দরপত্রের কোনো বিষয়ে ও তার মূল্যায়ন সম্পর্কে কোনো আলোচনা করা যাবে না।

ধারা ৫ অনুযায়ী দরপত্রদাতা নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয় তাহলে দরপত্রে মূল্যায়িত দরপত্রদাতা সম্পর্কে এবং তা ফলপ্রসূ না হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দরদাতাদের যোগ্যতা অনুরূপভাবে নির্ধারণ করবে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়েল আওতাধীন সংস্থা পূর্তভবনে দুর্নীতির ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। যার মধ্যে ইজিপি পদ্ধতিতে দুর্নীতির ব্যাপারটি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে গণপূর্ত অধিদপ্তরে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন (এস্টিমেট) থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি।

এসব দুর্নীতির সঙ্গে ঠিকাদার আর কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তরে নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইজিপিতে টেন্ডার দিতে গিয়ে এমন অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ পায় দুদক। টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণকাজের নকশা পরিবর্তন করে থাকেন।

ইজিপি পদ্ধতিতে অনিয়ম-দুর্নীতি থেমে নেই এরপরও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, চলতি বছরের মধ্যেই সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের দরপত্র ইজিপির মাধ্যমে করা হবে। ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতির মাধ্যমে শতভাগ সরকারি কেনাকাটা বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি দূর হবে বলে মনে করেন তিনি।

ইজিপিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম আমার সংবাদকে বলেন, অসাধু ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রণ করতে কর্মকর্তারাও সরাসরি সহায়তা করছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সব সংস্থার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যুক্ত সব সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া দরকার।

তিনি আরও বলেন, প্রকৌশলীদের টাকা দিতে দিতে শেষ, ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়। ইজিপি পদ্ধতি যেটা তা তো মানছে না। ইজিপি দিতে হলে সমস্ত টেন্ডার ডকুমেন্ট আপ টু ডেট, ফাইলপত্র, কাগজপত্র আপ টু ডেট কইরা, টেন্ডার কল করবে।

কিন্তু এর (প্রকৌশলীরা) কাজের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন (এস্টিমেট) করতে হবে। কিন্তু সেখানে এসব কাগজপত্র সঠিক করার আগেই প্রকৌশলীরা টেন্ডার কল করেন। টেন্ডার কল করার পর কাগজপত্র প্রোসেসিং করেন।

এতে বাধ্যতামূলক ঠিকাদাররা প্রকৌশলীদের কাছে গিয়ে কাজের জন্য কাগজপত্র স্বাক্ষর করান। যেকোনো কাজের ভাগবাটোয়ারা পেতে এই কৌশল অবলম্বন করেন প্রকৌশলীরা। অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে দায়িত্বরত প্রকৌশলীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরাঘুরি করে কাজের এস্টিমেট অনুমোদন করাতে হয়।

অথচ ইজিপির নিয়ম— এস্টিমেট শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার পর টেন্ডার কল করলে ঠিকাদাররা অংশগ্রহণ করবেন। সেখানে টেন্ডার পাওয়ার পর ওয়ার্ক অর্ডার আনতে অফিসে যাবেন ঠিকাদাররা। কিন্তু ইজিপির এই নিয়ম কোথাও মানছে না।

এছাড়া কাজের ২ থেকে ৩ শতাংশ অর্থ ইঞ্জিনিয়াররা নেন। আর বড় কাজগুলোর ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৬ শতাংশ অর্থও নেন তারা। আর ঠিকাদাররা বিল তুলতে গেলে প্রকৌশলীদের টাকা দিতেই হবে। টাকা না পেলে বিলে স্বাক্ষর করেন না। প্রকৌশলীরা ভাবেন, এটি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি।

 

সুত্র : আমারসংবাদ

ইজিপিতেও থেমে নেই অনিয়ম-দুর্নীতি

Our Like Page