কৃষি প্রধান এই দেশে সনাতন কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তথা বিজ্ঞান-ভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও কৃষি-বিজ্ঞান ভিত্তিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার লক্ষে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে ১২০০ একর জায়গার উপর গড়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)।

কৃষিবিদদের অবদান, শিক্ষক ও গবেষকদের গবেষণার অবদানে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এছাড়া কৃষিকে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একাধিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কৃষিতে পড়াশোনা করে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক ভালো চাকরি পাওয়া যায়। রয়েছে দেশের বাইরে কৃষি নিয়ে কাজ করার অপার সুযোগ। কৃষিবিদদের দিগন্ত এখন অনেক বিস্তৃত। সব মিলিয়ে কৃষিবিদদের পেছনেই যেন চাকরি ছুটছে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশ কয়েকটি অনুষদে কৃষিভিত্তিক পড়াশোনা করানো হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও কৃষি বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে। ভালো ফল করলে সেখানে শিক্ষকতার সুযোগও থাকছে। অনেকেই সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করছেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় কৃষিবিদেরা টেকনিক্যাল ও সাধারণ উভয় ক্যাডারে আবেদনের সুযোগ পাওয়ায় দেশের সব কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারবেন। তাছাড়া কৃষি ব্যাংকগুলোতে অগ্রাধিকারসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে চাকরি করছেন কৃষিবিদেরা। বিভিন্ন সরকারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে লেকচারার হয়ে যোগ দেয়া যায়।

কৃষি অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসের মাধ্যমে উপজেলাগুলোতে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন। কৃষিবিদদের খুবই পছন্দের জায়গা হলো সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ তুলা গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়ে যোগ দিচ্ছেন।

এছাড়া অনেক কৃষিবিদ উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিলেও কৃষিবিদরা কাজ করছেন। এছাড়া সার কারখানা, চিনিকল, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কীটনাশক তৈরির কারখানা, ব্র্যাক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানিতেও কাজ করছেন।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা পূরণে ভেটেরিনারি (পশু চিকিৎসা বিদ্যা) ও অ্যানিমেল হাজব্যান্ড্রি (পশুপালন) স্নাতকদের রয়েছে একচ্ছত্র অবদান। দেশের অন্যতম বড় শিল্প পোলট্রিসহ ডেইরি, পশুখাদ্য উৎপাদন ও পশুর ওষুধ উৎপাদনে কাজ করছেন ওই স্নাতকেরা।

পশুচিকিৎসা ও পশুপালন দুটি আলাদা ক্ষেত্রে। ভেটেরিনারি থেকে পাস করে বিসিএস পরীক্ষায় ভেটেরিনারিয়ানরা উপজেলাগুলোতে ভেটেরিনারি সার্জন হয়ে যোগদান করেন। একই পরীক্ষায় পশুপালন অনুষদের স্নাতকেরা উপজেলাগুলোতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পশু উৎপাদন কর্মকর্তা কিংবা পোলট্রি উন্নয়ন কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন এবং পরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পান।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিএলআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন সরকারি ফার্ম ও গবেষণা কেন্দ্র আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান সাভারের বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় গো প্রজনন কেন্দ্র ও দুগ্ধ খামার, কক্সবাজারের হরিণ প্রজনন কেন্দ্র, সিলেটে ছাগল প্রজনন কেন্দ্র, বাগেরহাটে মহিষ প্রজনন কেন্দ্র, বেশ কয়েকটি জায়গায় কুমির প্রজনন কেন্দ্র এবং বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে শুধু ভেটেরিনারি ও পশুপালন স্নাতকেরাই চাকরি করছেন।

বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় ক্যাডারে কিউরেটর এবং নন-ক্যাডারে জ্যু অফিসার হিসেবে চাকরি করতে পারেন এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তবে বেসরকারি পর্যায়েও কাজের ক্ষেত্র বেশ ব্যাপক। বেসরকারি দুগ্ধ ও পোলট্রির খামার, ব্র্যাক, ফিড মিল, এনজিও এবং আন্ত্রর্জাতিক সংস্থায় চাকরির সুযোগ থাকছে। এসবের মধ্যে আড়ং ডেইরি, কাজী ফার্মস, আফতাব বহুমুখী ফার্ম, মিল্ক ভিটা, সিপি ফুড উল্লেখযোগ্য।

মাছ উৎপাদনে মৎস্যজীবীদের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে ফিশারিজ বা মাৎস্য বিজ্ঞান গ্র্যাজুয়েটদের গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রম। অনেক ফিসারিজ গ্র্যাজুয়েট ব্যক্তিগত খামার ও হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করে মৎস্য উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়েছেন। বিসিএস পরীক্ষায় মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসের মাধ্যমে টেকনিক্যাল কোটায় উপজেলাগুলোতে মৎস্য কর্মকর্তা এবং মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে ময়মনসিংহে স্বাদু পানি কেন্দ্র, চাঁদপুরের নদী কেন্দ্র, খুলনার লোনা পানি কেন্দ্র, বাগেরহাটের চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র এবং কক্সবাজারে অবস্থিত সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়েছে যোগ দেয়া যায়। এছাড়া এর পাঁচটি উপকেন্দ্রে এই সুযোগ থাকছে। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিশ সেন্টারে চাকরির সুযোগ থাকছে।

কৃষি প্রকৌশলীরা চাকরি ক্ষেত্রে ভালো স্থান দখল করে আছেন। কৃষি প্রকৌশলীদের পছন্দের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিল, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি। এসিআই, সিনজেনটা, কাজী ফার্মস ছাড়াও কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন অনেকে।

এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি প্রকৌশল অনুসদের আয়তায় বি.এসসি ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ানো হয়, যা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত এবং খাদ্যের গুণগতমান নির্ধারণ করা প্রতিষ্ঠানে চাকরির পথ খুলে দেয়।

কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন কৃষি অর্থনীতি গ্র্যাজুয়েটরা। কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র অর্থনীতি বিভাগ রয়েছে যেখানে কৃষি অর্থনীতির শিক্ষার্থীদের গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। পাশপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, বীমা, এনজিও এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করার সুযোগতো আছেই। বর্তমানে বিসিএস এ কৃষি বিপণন নামে নতুন একটি স্বতন্ত্র কারিগরি কোটা চালু হয়েছে যেখানে সাধারণ অর্থনীতি ও কৃষি অর্থনীতির স্নাতকধারীরা আবেদন করার সুযোগ পাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ : কৃষি বিষয়গুলোতে পড়তে পারেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি)।

এছাড়া স্বল্প পরিসরে কৃষিবিষয়ক পাঠক্রম চালু রয়েছে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ফিশারিজ কলেজ ও ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজে।

চাকরিই ছুটছে তাদের পিছু

প্রতিনিধিবাকৃবিকৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কৃষিবান্ধব সরকার কৃষিকে আধুনিকীকরণ ও অধিকতর লাভজনক করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দেশে লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে সম্প্রতি তিন হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। আমরা এরই মধ্যে ‘জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা, ২০২০’ প্রণয়ন করেছি। এছাড়া মাঠপর্যায়ে কৃষি প্রকৌশলী নিয়োগের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কৃষি প্রকৌশল উইং স্থাপনে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কৃষক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কৃষি প্রকৌশলীরা সহযোগিতা করবেন।’

সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবায়নাধীন ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট স্কেল মেকানাইজেশন ইনোভেশন হাব, বাংলাদেশ’ (আসমি) প্রকল্প আয়োজিত ‘লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি: বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার চাবিকাঠি’ শীর্ষক বার্ষিক কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন কৃষিমন্ত্রী।

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপে লাগসই কৃষিযন্ত্রের প্রয়োগ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। ধানের চারা রোপণের সময় শ্রমিক সংকটসহ শ্রমিকের বাড়তি মজুরি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে, অপরদিকে উৎপাদন ব্যাহত করে। আরেক দিকে আমাদের দেশে সনাতন পদ্ধতিতে অসংখ্য শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রমে এবং বহু শ্রমঘণ্টার বিনিময়ে ধান কাটা ও মাড়াই-ঝাড়াই করা হয়। এসবের ফলে ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকার কানসাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় যৌথভাবে ‘ফিড দ্য ফিউচার’ কর্মসূচি ও ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট স্কেল মেকানাইজেশন ইনোভেশন হাব, বাংলাদেশ’ (আসমি) গবেষণা প্রকল্পটি বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করেছে।  বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য গবেষণার মাধ্যমে চাহিদামতো উন্নত কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করে ফসলের মূল্য নির্ণয়ে সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয়ের জন্য লাগসই যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এই গবেষণার মূল লক্ষ্য।

কৃষি প্রকৌশল উইং স্থাপনে মন্ত্রণালয় কাজ করছে: কৃষিমন্ত্রী

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, মাঠ পর্যায়ে কৃষি প্রকৌশলী নিয়োগের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কৃষি প্রকৌশল উইং স্থাপনে কৃষি মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কৃষক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কৃষি প্রকৌশলীরা সহযোগিতা করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে কৃষিবান্ধব সরকার কৃষিকে আধুনিকীকরণ ও অধিকতর লাভজনক করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। দেশে লাগসই কৃষিযন্ত্রপাতি জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে সম্প্রতি ৩ হাজার ২০ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। এছাড়া, ইতোমধ্যে ‘জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০’ প্রণয়ন করা হয়েছে।’ বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবায়নাধীন ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট স্কেল মেকানাইজেশন ইনোভেশন হাব-বাংলাদেশ (আসমি) প্রকল্প আয়োজিত ‘লাগসই কৃষিযন্ত্রপাতি : বাংলাদেশে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তার চাবিকাঠি’ শীর্ষক বার্ষিক কর্মশালা উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের কৃষি কাজের প্রতিটি ধাপে লাগসই কৃষি যন্ত্রের প্রয়োগ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। ধানের চারা রোপণের সময় শ্রমিক সংকটসহ শ্রমিকের বাড়তি মজুরি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে অপরদিকে উৎপাদন ব্যাহত করে। আরেকদিকে, আমাদের দেশে সনাতন পদ্ধতিতে অসংখ্য শ্রমিকের কঠোর পরিশ্রমে, বহু শ্রম ঘন্টার বিনিময়ে ধান কাটা, মাড়াই-ঝাড়াই করা হয়। এসবের ফলে ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে, কৃষিকে লাভজনক করার জন্য ভৌগোলিক ও কৃষিপরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক একেক এলাকায় একেক ধরনের কৃষিযন্ত্রপাতির ব্যবহার করতে হবে। কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্রপাতি তৈরিতে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। যাতে বাংলাদেশ আগামী দিনে শুধুমাত্র আমদানিকৃত কৃষিযন্ত্রপাতির উপর নির্ভর না করে। সেজন্য স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দিচ্ছে যাতে এদেশের উপযোগী কৃষিযন্ত্রপাতি তৈরি করতে পারে ও বিদেশ থেকে আনা যন্ত্রপাতিকেও এদেশের উপযোগী করতে পারে। এক্ষেত্রে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহকে একত্রে যৌথভাবে লাগসই দেশীয় কৃষিযন্ত্রপাতি উদ্ভাবনে গবেষণা, উদ্ভাবিত যন্ত্রের উন্নয়ন ও জনপ্রিয়করণের কাজ করতে হবে।’ বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা ও পরিবেশ রয়েছে উল্লেখ করে ড. রাজ্জাক বলেন, কৃষিযন্ত্রপাতি তৈরিতে বিদেশি বিনিয়োগ দরকার। সেজন্য দেশি-বিদেশি যৌথ উদ্যোগকে আমরা উৎসাহ প্রদান করি। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং আমেরিকার কানসাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় যৌথভাবে ‘ফিড দ্য ফিউচার’ কর্মসূচি ও ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে ‘অ্যাপ্রোপ্রিয়েট স্কেল মেকানাইজেশন ইনোভেশন হাব-বাংলাদেশ (আসমি) গবেষণা প্রকল্পটি বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করেছে। বাংলাদেশের কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য গবেষণার মাধ্যমে চাহিদামত উন্নত কৃষিযন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করে ফসলের মূল্য নির্ণয়ে সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয়ের জন্য লাগসই যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এই গবেষণার মূল লক্ষ্য। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৪ বছর মেয়াদী প্রকল্পটি বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ৪টি জেলার ৪টি উপজেলা নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। কর্মশালায় মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিশক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ও আসাম-বাংলাদেশ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মঞ্জুরুল আলম। আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের অধ্যাপক ও অ্যাপ্রোপ্রিয়েট স্কেল মেকানাইজেশন কনসর্টিয়ামের পরিচালক প্রশান্ত কুমার কলিতার সভাপতিত্বে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. লুৎফুল হাসান, আমেরিকার কানসাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ফিড দ্য ফিউচার ইনোভেশন ল্যাব ফর কলাবোরেটিভ রিসার্চ অন সাসটেইনেবল ইনটেনসিফিকেশনের পরিচালক পিভি ভারা প্রসাদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর এম. এ. সাত্তার মন্ডল, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. ওয়ায়েস কবীর ও কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাক্তন মহাপরিচালক মো. হামিদুর রহমান বক্তব্য রাখেন।- বাসস

মাঠ পর্যায়ে কৃষি প্রকৌশলী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে: কৃষিমন্ত্রী

 

আমাদের প্রকৌশল ডেস্ক ।।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবী জুড়ে নেমে এসেছে মানবিক দুর্যোগ। ইতোমধ্যে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে সারাবিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা এক কোটি অতিক্রম করেছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ ভাইরাসটিতে মারা গেছেন। করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বিশ্বব্যাপী। নিজ নিজ দেশের জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার সরবরাহের তাগিদে খাদ্যপণ্য রফতানি সীমিত অথবা বন্ধ করে দিতে পারে রফতানিকারক অনেক দেশ। ফলে খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলো খাদ্যপণ্যের সংকটে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা (এফএও) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের সংকট তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, জাতিসংঘ শিশু তহবিল এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের যৌথ উদ্যোগে ১৫ জুলাই ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এসডিজি) ২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। দেশে করোনা ভাইরাসজনিত রোগ এর বর্তমান পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ৩১ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন। এর একটি হচ্ছে ‘খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে। অধিক ফসল উৎপাদন করতে হবে। খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যা যা দরকার করতে হবে। কোন জমি যেন পতিত না থাকে।’
খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি। বর্ধিত ফসল উৎপাদন করার জন্য প্রয়োজন উচ্চফলনশীল জাত, উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনা এবং একক জমিতে ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা। ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা ও উন্নত ফসল ব্যবস্থাপনার একটি অঙ্গ হচ্ছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার, ফসলের উৎপাদন খরচ ও ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতি কমানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর বিপরীতে কমছে কৃষি জমি। এছাড়াও কৃষি শ্রমিকদের ক্রমবর্ধমান হারে শিল্প, পরিবহন, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে স্থানান্তরের ফলে কৃষি শ্রমিকের হার ২০০২-০৩ অর্থবছরে ৫১.৬৯ শতাংশ; ২০১০ অর্থবছরে ৪৭.৩০ শতাংশ; ২০১৩ সালে ৪৫.১০ শতাংশ এবং ২০১৬-১৭ সালে ৪০.৬২ শতাংশতে নেমে এসেছে (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৯)। এই ক্রমহ্রাসমান কৃষি শ্রমিকের জন্য ফসল উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায়ে যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে শ্রমিক স্বল্পতার অভাব দূর করা আবশ্যক। এছাড়াও জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে আকস্মিক বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মত দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে বাংলাদেশ। এর ফলে শস্যহানির ঝুঁকি বাড়ছে প্রতিনিয়ত। এ সকল সমস্যা উত্তরণে দেশে খাদ্য নিরাপত্তায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য।
বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার নিকট অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে বাজার মূল্যের ৬০ ভাগ ছাড়ে বারি ও ব্রি উদ্ভাবিত কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- হাইস্পিড রোটারি টিলার, বীজ বপন যন্ত্র, বেড প্লান্টার, জমি নিড়ানি যন্ত্র, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, শস্য মাড়াই যন্ত্র, ধান-গম কর্তন যন্ত্র ও শস্য ঝাড়াই যন্ত্র প্রদান করেছে। হাওড় ও দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকায় ৭০ শতাংশ ও অবশিষ্ট এলাকায় ৫০ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তা/ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে কম মূল্যে পাওয়ার টিলার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, রিপার, কম্বাইন হারভেস্টার, পাওয়ার টিলার চালিত সিডার, পাওয়ার থ্রেসার ও ফুটপাম্প কৃষি যন্ত্রপাতি প্রদান করেছে যা কৃষি যান্ত্রিকীকরণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
কৃষি যন্ত্রের কার্যকরী ব্যবহার নিশ্চিতকরণের জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, মাঠ প্রদর্শনী আয়োজনের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক মেকানিককে কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে সেই সাথে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুত কারকদেরও মানসম্পন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে দেশে জমি চাষ, আগাছা দমন, কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ এবং ফসল মাড়াই এর কাজে যথাক্রমে শতকরা ৯০, ৬৫, ৮০, ৯৫ এবং ৭০ ভাগ যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব হয়েছে। তবে চারা রোপণ, সার প্রয়োগ, ফসল কর্তন, ফসল ঝাড়াই, ফসল শুকানো ও গুদামজাতকরণের ক্ষেত্রে এখনো তেমন যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব হয়নি।
সরকার করোনা ভাইরাসজনিত আপদকালীন সময়ে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে এবং বোরো মৌসুমে বরাদ্দকৃত অর্থের মাধ্যমে কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশেষভাবে ধান কর্তনের সময় কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার যন্ত্র ব্যবহারের ফলে বোরোর সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া গেছে। করোনা পরবর্তী খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণের লক্ষ্য অর্জনে নিম্নরূপ কর্মকৌশল গ্রহণ করা যেতে পারে:
১. সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমুহ কৃষি কাজের বিভিন্ন স্তরে দেশীয় উপযোগী ও লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নের কাজ করা। এক্ষেত্রে চারা রোপন যন্ত্র, বীজ বপন যন্ত্র, শস্য কর্তন যন্ত্র, কম্বাইন হার্ভেস্টার, সুগারক্রপ প্লান্টার, হারভেস্টার ও ক্রাসার, শস্য শুকানো যন্ত্র, শস্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার ও সেন্সর বেইজ গবেষণার উপর জোর দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে রোবোটিক্স এর ব্যবহার প্রয়োজন হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কৃষি প্রকৌশল বিষয়ক সিলেবাস সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
২. দেশে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আমদানি নির্ভরতা হ্রাসকরণে দেশীয় কৃষি জমি উপযোগী খরচ সাশ্রয়ী যন্ত্র প্রস্তুতের সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ ও শ্রম ও সময় সাশ্রয়ী কৃষি যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, যন্ত্র ক্রয়ে মূলধন প্রাপ্তি সহজলভ্যকরণ এবং যন্ত্র প্রস্তুতকরণ শিল্প উদ্যোক্তাদের মূলধন সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা করা। ইঞ্জিন, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, চারা রোপণ যন্ত্র, রিপার ও কম্বাইন হার্ভেস্টার প্রস্তুতের জন্য নিজস্ব অথবা যৌথ উদ্যোগে দেশীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টির পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে অনুকূল আমদানি ও রফতানি শুল্ক হার নির্ধারণ করা এবং পাশাপাশি আধুনিক কৃষি যন্ত্র প্রস্তুত সুবিধা সম্বলিত জোন ভিত্তিক হিট ট্রিটমেন্ট, কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত মেশিন সুবিধা সরকারিভাবে স্থাপন করা। বিভিন্ন এগ্রো ইকোলজিক্যাল জোনে মাঠ পরীক্ষণ ও যন্ত্রের ত্রুটি বিচ্যুতি সংশোধনের মাধ্যমে দেশীয় উপযোগী করে তা সম্প্রসারণ করা।
৩. ব্যাপক আকারে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক উদ্ভাবিত/উন্নয়নকৃত দেশীয় প্রস্তুতকৃত ও আমদানিকৃত লাগসই কৃষি যন্ত্রের কার্যকারিতার মাঠ প্রদর্শনী, মাঠ দিবস, উদ্বুদ্ধকরণ ভ্রমণ, মেলা, কর্মশালা, কৃষকের অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রচার মাধ্যমে সম্প্রচার এবং কৃষক ও কৃষক সংগঠন এর মাঝে প্রচারপত্র বিলিকরণ কার্যক্রমসমূহ সরকারি সম্প্রসারণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিরবিচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে আধুনিক কৃষি যন্ত্র জনপ্রিয়করণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা।
৪. দেশে প্রস্তুতকৃত ও আমদানিকৃত যন্ত্রের মান উন্নয়নের নিমিত্ত সরকারি ও বেসরকারিভাবে মান পরীক্ষা ও প্রত্যয়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৫. কৃষি যন্ত্র ও প্রযুক্তি কৃষকের দোড় গোড়ায় পৌঁছানোর জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কৃষি প্রকৌশলীদের জন্য আলাদা উইং তৈরি করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক জনবল নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণ ও ভৌত সুবিধা বৃদ্ধি করা। একই সাথে নার্সভুক্ত প্রতিষ্ঠানসমুহে জনবল বৃদ্ধি করে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা।
৬ কৃষক, চালক, মেকানিক, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, প্রস্তুতকারী, গবেষক, সম্প্রসারণ কর্মী ও নীতি নির্ধারকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে কৃষি যন্ত্র ব্যবহার ও উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
৭. কৃষি যন্ত্র সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী চালু করা।
৮. জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে কৃষকের মালিকানাধীন জমি ক্রমশ: খণ্ড খণ্ড হয়ে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছে। পূর্ণ দক্ষতায় কৃষি যন্ত্র ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে নানাবিধ ও স্থানীয় উপযোগী কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে চাষযোগ্য জমির সমন্বয়, ফসলের সমন্বিত বপন ও কর্তন করা।
৯. যেসব এলাকায় ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-পরিস্থ সেচ পানির অপর্যাপ্ততা রয়েছে এবং বিভিন্ন কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে সেসব এলাকায় সমন্বিতভাবে সেচ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার প্রবর্তন করা।
১০. দেশের কৃষি জমিতে আধুনিক কৃষি যন্ত্র চলাচলের জন্য সমন্বিতভাবে সরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগে টেকসই রাস্তা তৈরি করা।
১২. দেশীয় কৃষি যন্ত্র প্রস্তুতকরণ শিল্প স্থাপনকারীদের এবং মাঠ পর্যায়ের যন্ত্র ক্রয়কারী কৃষক/উদ্যোক্তাদের সহজশর্তে ও সরকারি বিশেষ সুবিধার আওতায় ন্যুনতম সুদের হারে ঋণ প্রদান করা।
১৩. নিরাপদ কৃষি যন্ত্র চালনার জন্য প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা করা।
১৪. যন্ত্রনির্ভর আধুনিক ও ঝুঁকিমুক্ত পেশা হিসাবে গড়ে তুলতে কৃষি যন্ত্রের সংশ্লিষ্ট চালক, কৃষি যন্ত্র সেবাপ্রদানকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে বীমা চালু করা।
উল্লেখিত কর্মকৌশল যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ত্বরান্বিত হবে। ফলে করোনা মহামারীর কারণে কৃষি ক্ষেত্রে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবেলা এবং ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনসহ খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সম্ভব হবে।

লেখক: মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (কৃষি প্রকৌশল), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, ঢাকা

করোনা মহামারি সময়ে খাদ্য নিরাপত্তায় টেকসই কৃষি যান্ত্রিকীকরণে করণীয়

Our Like Page