সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে  মতবিরোধ

আমাদের প্রকৌশল ডেস্ক :

বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো অবকাঠামোর উন্নয়নকাজ শেষ করার পরের তিন বছর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে সেটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিতে হয়। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে সড়কে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারকে নিজ খরচে তা ঠিক করে দিতে হবে। তবে ঠিকাদাররা এত দীর্ঘ সময় ধরে সড়ক অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ভার নিতে চাইছেন না। তারা রক্ষণাবেক্ষণের দায় এক বছর করার দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা বলছেন উন্নয়নকাজের গুণগত মান ঠিক রাখার স্বার্থেই এ নিয়ম করা হয়েছে, যা বদলানোর কোনো চিন্তাভাবনা আপাতত তাদের নেই।

উন্নয়নকাজ শেষ হওয়ার পর একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সেটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়-দায়িত্ব ঠিকাদারকে দেয়ার বিষয়টিকে বলা হয় ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড (ডিএলপি)। সড়ক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে আদর্শ ডিএলপি সাধারণত ১২ মাস। সওজ অধিদপ্তরেও কয়েক বছর আগে ডিএলপি ১২ মাসই ছিল। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক-মহাসড়ক অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর পরই নষ্ট হয়ে যাওয়া, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগসহ ঠিকাদারদের মানহীন কাজের জন্য এর মেয়াদ বাড়িয়ে ৩৬ মাস নির্ধারণ করে সওজ অধিদপ্তর। তবে এটি কেবল বড় বড় উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য রেখেছে সংস্থাটি। ছোট কাজের ক্ষেত্রে রক্ষণাবেক্ষণের মেয়াদ ১২ মাসই রয়েছে।

ডিএলপি বাড়ানোর প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাইলে সওজের প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সবুর বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের সময় বাড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, সড়ক অবকাঠামো খাতে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ করছে সরকার। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায়, বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও অবকাঠামো টেকসই হয় না। এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ডিএলপি বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে ঠিকাদাররা কাজ করার সময় সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বন করবেন। তারা টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলবেন, যেন সেটিতে পরবর্তী সময়ে রক্ষণাবেক্ষণের খুব একটা প্রয়োজন না হয়।

ঠিকাদাররা প্রায়ই ডিএলপির মেয়াদ আবার এক বছর করার দাবি জানান উল্লেখ করে এ কর্মকর্তা বলেন, এ নিয়ে আমরা এখনো কোনো পরিকল্পনা করছি না।

দীর্ঘমেয়াদি ডিএলপির কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে জানান ঠিকাদাররা। কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, ডিএলপির সঙ্গে কাজের বিল আদায়ের বিষয়টি জড়িত। ডিএলপি দীর্ঘ হওয়ার কারণে বিল পেতেও দেরি হয়। সম্প্রতি একটি অংশীজন সভায় ডিএলপি কমানোর দাবি জানান সওজ অধিদপ্তর ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার কামাল ফিরোজ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী একটি কাজের মোট বিলের ১০ শতাংশ কেটে রাখা হয় ডিএলপির জন্য। অর্থাৎ নির্মাণ পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নির্ধারিত তিন বছর সময় শেষ হওয়ার আগে ঠিকাদার কেটে রাখা এ ১০ শতাংশ টাকা পাবেন না। এটা এক বছর হলে ক্ষতি নেই। তাতে আপত্তিও নেই। কিন্তু পুরো বিল পাওয়ার জন্য কাজ শেষ করার তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে—এটা কেমন নিয়ম? এ নিয়মের কারণে ঠিকাদাররা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

তিনি আরো বলেন, পিপিআরের (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০০৮) কোথাও ডিএলপি তিন বছর করার কথা উল্লেখ নেই। এলজিইডি, পিডব্লিউডির মতো বড় সংস্থাগুলোতেও এ সময় এক বছর। কিন্তু সওজ অধিদপ্তর এটা তিন বছর করে রেখেছে। এটা পুরোপুরি অযৌক্তিক।

সওজ অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়ক অবকাঠামোর ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়েই আদর্শ ডিএলপি ১২ মাস। এ সময় নির্ধারণ করার ক্ষেত্রেও যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। ঠিকাদার কেবল অবকাঠামোর নির্মাণজনিত ত্রুটিরই দায় নেবেন। আর এ নির্মাণজনিত ত্রুটির জন্য ১২ মাস সময়ই যথেষ্ট। সাধারণত আবহাওয়ার ভিন্নতার নিরিখে সড়কের টেকসই যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য ডিএলপি ১২ মাস নির্ধারণ করা হয়।

সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ-পরবর্তী দায় শুধু ঠিকাদারদের ওপরই চাপিয়ে দেয়ার পক্ষপাতী নন বিশেষজ্ঞরা। তারা মনে করেন, যেসব সংস্থা অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকে, নির্মাণ-পরবর্তী দায় সেসব সংস্থার প্রকৌশলীদের ওপরও অনেকটুকু বর্তায়। এ সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে গুণগত মান বজায় রেখে কাজ আদায়ের দায়িত্ব কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের। আবার সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণের পর নকশাগত জটিলতার কারণেও অনেক সময় ত্রুটি দেখা দেয়। এক্ষেত্রে দায়টা যারা নকশা প্রণয়ন করেছেন তাদের ওপর বর্তায়, ঠিকাদারের ওপর নয়।

সড়ক অবকাঠামোর নির্মাণ-পরবর্তী দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়টি বেশ জটিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ডিএলপি সাধারণত এক বছরই হওয়া উচিত। তবে যেসব বড় বড় কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে ঠিকাদারদের সঙ্গে আলোচনা করে ডিএলপি বাড়ানো যেতে পারে।

     More News Of This Category

Our Like Page