কর্মক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের নিরাপত্তাহীনতা

মো. কবির আহমেদ ভূঞা

রাজধানী ঢাকার অতি নিকটবর্তী শিল্প শহর গাজীপুর সিটি করপোরেশনে নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের নির্মম হত্যাকান্ডটি মাঠপর্যায়ে কর্মরত প্রকৌশলীদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। প্রচারমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মরহুম প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিছু ঠিকাদারকে কাজের অনুমতি না দিয়ে অথবা নিম্নমানের কাজের জন্য বিল প্রদানে অসম্মতি জানানোর কারণেই তাকে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হতে হয়েছে। সরকারি তথা জনগণের অর্থ লোপাট, ডাকাতির অপচেষ্টা ব্যর্থ করা এই সাহসী প্রকৌশলীর হত্যাকান্ড দেশের প্রচারমাধ্যমগুলোতে ও সুধীসমাজের মধ্যে খুব একটা আলোচিত হতে দেখা যায়নি। শুধু ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনের তেমন তৎপরতাও দৃশ্যমান হয়নি। পাশাপাশি, কুমিল্লার দাউদকান্দিতে এলজিইডির থানা ইঞ্জিনিয়ার সম্প্রতি একজন ঠিকাদার দ্বারা লাঞ্ছিত হয়েছেন। নিম্নমানের কাজে বাধা দেওয়ায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের রাজশাহীর প্রকৌশলী মো. দেলোয়ার হোসেন দুর্বৃত্ত ঠিকাদার কর্তৃক আহত এবং রক্তাক্ত হন। চাঁদপুরে কচুয়া উপজেলার শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী উপজেলা চেয়ারম্যান কর্তৃক লাঞ্ছিত হয়েছে। এসব ঘটনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্র্তৃক গ্রেপ্তার হলেও তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
উপরোক্ত ঘটনাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে যে, অনেক সময় মাঠপর্যায়ে কর্মরত প্রকৌশলীরা ঠিকাদারদের অনৈতিক দাবি মেনে না নিলে নিহত বা লাঞ্ছিত হচ্ছেন। ফলে প্রকৌশলীরা কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিয়ে এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। প্রকৌশলীদের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড বা লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাগুলো প্রচারমাধ্যমে আশানুরূপভাবে প্রচারিত হচ্ছে না। কিন্তু সম্প্রতি অন্য একটি সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তার দুর্বৃত্ত কর্তৃক আহত এবং রক্তাক্ত হওয়ার ঘটনা প্রচারমাধ্যমগুলোতে বেশ গুরুত্বসহকারে প্রচার পায়। সরকারের উচ্চপর্যায়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীসহ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ওই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন। ফলে ওই সার্ভিসের কর্মকর্তারা ন্যায়নীতির সঙ্গে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছেন। প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সুফল পাওয়া যাবে। কিন্তু তা না হলে প্রকৌশলীরা মনে করতে পারেন, সঠিকভাবে সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী দ্বারা হতাহতের শিকার হলে তাদের এবং তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
জেলাপর্যায়ে জেলা জজ, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সরকার কর্র্তৃক নিয়োজিত সশস্ত্র গানম্যান পেয়ে থাকেন। তা ছাড়া জেলা আনসার অ্যাডজুডেন্ট, র‌্যাব কমান্ডাররাও অনুরূপ সুবিধা পেয়ে থাকেন। বিভিন্ন দায়িত্ব অর্থাৎ সরকারি স্বার্থ তথা সরকারি সম্পদ রক্ষায় এবং আইন প্রয়োগের কারণে তাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার শঙ্কা থাকে বিধায় তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হয়ে থাকে। তাই একই সঙ্গে সরকারের শতকোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং শতকোটি টাকার বিল প্রদানের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য গানম্যান নিয়োজিত করা প্রয়োজন।
এক শ্রেণির সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক লেবাসধারী ঠিকাদার সব সময়ই নিম্নমানের কাজ করে বা কাজ না করে সরকারি অর্থ তুলে নেওয়া অথবা টেন্ডার সন্ত্রাস করে প্রকৌশলীদের সব সময়ই ভীত-সন্ত্রস্ত রাখার অপচেষ্টা করে। সৎ, নিষ্ঠাবান প্রকৌশলীরা তাদের সব অন্যায্য দাবি মেনে না নিলেই তার ওপর নেমে আসে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন। এমনকি তিনি হত্যার শিকারও হতে পারেন। যার জ্বলন্ত উদাহরণ গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের সাম্প্রতিক হত্যাকান্ডের ঘটনা। ফলে জনগণের স্বার্থ ও সম্পদ রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত প্রকৌশলীরা তাদের জীবনকে অনিরাপদ রেখে কীভাবে গুণগতমান বজায় রেখে উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবেন?
এ দেশে বর্তমানে প্রকৌশলীরা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি পাচ্ছে না। পদ না থাকার অজুহাতে সব যোগ্যতা থাকার পরও যথাসময়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ পদ না থাকলেও অন্য একটি সার্ভিসের শত শত কর্মকর্তার গণপদোন্নতি হচ্ছে। প্রকৌশলীদের ক্ষেত্রেও অন্য সার্ভিস ক্যাডারের মতো সুপারনিউমারি পদ সৃষ্টি করে প্রকৌশলীদের পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা আবশ্যক। প্রকৌশলীরা যোগ্যতা থাকার পরও গ্রেড-৪-এর ওপর উঠতে পারছে না, ক্যাডারে জনবলের সংখ্যানুপাতে গ্রেড-১-এর একাধিক পদ থাকার যৌক্তিকতা থাকলেও সেখানে রয়েছে মাত্র ১টি পদ, গ্রেড-২-এর কোনো পদ রাখা হয়নি। এসব স্বীকৃত সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা থাকলেও তা সমাধানের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা এখনো গ্রহণ করা হয়নি। বেতন-বৈষম্যসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সব ক্ষেত্রে প্রকৌশলীরা বঞ্চিত।
এর সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা সমস্যা। ফলে প্রকৌশলীরা দিন দিন ব্যাপক সংখ্যায় প্রকৌশল পেশা ত্যাগ করে প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র, করসহ অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসে যোগ দিচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের বর্তমান এই দুরবস্থার গভীর প্রভাব পড়ার ফলে প্রকৌশল শিক্ষার প্রতি মেধাবীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। প্রকৌশল শাস্ত্রের মতো একটি বিশেষায়িত বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় মেধাবীদের প্রয়োজন রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে প্রকৌশলীদের অবস্থান, সম্মান,
স্বীকৃতিপ্রাপ্তির মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ সৃষ্টি করে থাকে। বর্তমান অবস্থার উন্নতি না হলে দেশে দীর্ঘ মেয়াদে মেধাবী প্রকৌশলী শূন্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দেশের নীতিনির্ধারকদের বিষয়টি এখনই ভেবে দেখা প্রয়োজন।

লেখক : সাবেক প্রধান প্রকৌশলী
গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ

     More News Of This Category

Our Like Page