চাকরিই ছুটছে তাদের পিছু

কৃষি প্রধান এই দেশে সনাতন কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তথা বিজ্ঞান-ভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে টেকসই কৃষি উন্নয়ন ও কৃষি-বিজ্ঞান ভিত্তিক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে তোলার লক্ষে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে ১২০০ একর জায়গার উপর গড়ে ওঠে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)।

কৃষিবিদদের অবদান, শিক্ষক ও গবেষকদের গবেষণার অবদানে বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। এছাড়া কৃষিকে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একাধিক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। কৃষিতে পড়াশোনা করে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক ভালো চাকরি পাওয়া যায়। রয়েছে দেশের বাইরে কৃষি নিয়ে কাজ করার অপার সুযোগ। কৃষিবিদদের দিগন্ত এখন অনেক বিস্তৃত। সব মিলিয়ে কৃষিবিদদের পেছনেই যেন চাকরি ছুটছে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বেশ কয়েকটি অনুষদে কৃষিভিত্তিক পড়াশোনা করানো হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও কৃষি বিষয়ে পড়ার সুযোগ আছে। ভালো ফল করলে সেখানে শিক্ষকতার সুযোগও থাকছে। অনেকেই সরকারি কলেজেও শিক্ষকতা করছেন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় কৃষিবিদেরা টেকনিক্যাল ও সাধারণ উভয় ক্যাডারে আবেদনের সুযোগ পাওয়ায় দেশের সব কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারবেন। তাছাড়া কৃষি ব্যাংকগুলোতে অগ্রাধিকারসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে চাকরি করছেন কৃষিবিদেরা। বিভিন্ন সরকারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে লেকচারার হয়ে যোগ দেয়া যায়।

কৃষি অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসের মাধ্যমে উপজেলাগুলোতে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন। কৃষিবিদদের খুবই পছন্দের জায়গা হলো সরকারি কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ তুলা গবেষণা ইনস্টিটিউট, মৃত্তিকা গবেষণা উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়ে যোগ দিচ্ছেন।

এছাড়া অনেক কৃষিবিদ উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিলেও কৃষিবিদরা কাজ করছেন। এছাড়া সার কারখানা, চিনিকল, বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, কীটনাশক তৈরির কারখানা, ব্র্যাক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানিতেও কাজ করছেন।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার আমিষের চাহিদা পূরণে ভেটেরিনারি (পশু চিকিৎসা বিদ্যা) ও অ্যানিমেল হাজব্যান্ড্রি (পশুপালন) স্নাতকদের রয়েছে একচ্ছত্র অবদান। দেশের অন্যতম বড় শিল্প পোলট্রিসহ ডেইরি, পশুখাদ্য উৎপাদন ও পশুর ওষুধ উৎপাদনে কাজ করছেন ওই স্নাতকেরা।

পশুচিকিৎসা ও পশুপালন দুটি আলাদা ক্ষেত্রে। ভেটেরিনারি থেকে পাস করে বিসিএস পরীক্ষায় ভেটেরিনারিয়ানরা উপজেলাগুলোতে ভেটেরিনারি সার্জন হয়ে যোগদান করেন। একই পরীক্ষায় পশুপালন অনুষদের স্নাতকেরা উপজেলাগুলোতে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পশু উৎপাদন কর্মকর্তা কিংবা পোলট্রি উন্নয়ন কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন এবং পরে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পান।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিএলআরআই) বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন সরকারি ফার্ম ও গবেষণা কেন্দ্র আছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান সাভারের বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় গো প্রজনন কেন্দ্র ও দুগ্ধ খামার, কক্সবাজারের হরিণ প্রজনন কেন্দ্র, সিলেটে ছাগল প্রজনন কেন্দ্র, বাগেরহাটে মহিষ প্রজনন কেন্দ্র, বেশ কয়েকটি জায়গায় কুমির প্রজনন কেন্দ্র এবং বন্য প্রাণী প্রজনন কেন্দ্রে শুধু ভেটেরিনারি ও পশুপালন স্নাতকেরাই চাকরি করছেন।

বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় ক্যাডারে কিউরেটর এবং নন-ক্যাডারে জ্যু অফিসার হিসেবে চাকরি করতে পারেন এই বিভাগের শিক্ষার্থীরা। তবে বেসরকারি পর্যায়েও কাজের ক্ষেত্র বেশ ব্যাপক। বেসরকারি দুগ্ধ ও পোলট্রির খামার, ব্র্যাক, ফিড মিল, এনজিও এবং আন্ত্রর্জাতিক সংস্থায় চাকরির সুযোগ থাকছে। এসবের মধ্যে আড়ং ডেইরি, কাজী ফার্মস, আফতাব বহুমুখী ফার্ম, মিল্ক ভিটা, সিপি ফুড উল্লেখযোগ্য।

মাছ উৎপাদনে মৎস্যজীবীদের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে রয়েছে ফিশারিজ বা মাৎস্য বিজ্ঞান গ্র্যাজুয়েটদের গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রম। অনেক ফিসারিজ গ্র্যাজুয়েট ব্যক্তিগত খামার ও হ্যাচারি প্রতিষ্ঠা করে মৎস্য উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়িয়েছেন। বিসিএস পরীক্ষায় মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা বিসিএসের মাধ্যমে টেকনিক্যাল কোটায় উপজেলাগুলোতে মৎস্য কর্মকর্তা এবং মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা হয়ে যোগ দেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে ময়মনসিংহে স্বাদু পানি কেন্দ্র, চাঁদপুরের নদী কেন্দ্র, খুলনার লোনা পানি কেন্দ্র, বাগেরহাটের চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র এবং কক্সবাজারে অবস্থিত সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হয়েছে যোগ দেয়া যায়। এছাড়া এর পাঁচটি উপকেন্দ্রে এই সুযোগ থাকছে। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিশ সেন্টারে চাকরির সুযোগ থাকছে।

কৃষি প্রকৌশলীরা চাকরি ক্ষেত্রে ভালো স্থান দখল করে আছেন। কৃষি প্রকৌশলীদের পছন্দের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হলো, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা কাউন্সিল, পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি। এসিআই, সিনজেনটা, কাজী ফার্মস ছাড়াও কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন অনেকে।

এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষি প্রকৌশল অনুসদের আয়তায় বি.এসসি ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়ানো হয়, যা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি খাদ্য প্রক্রিয়াজাত এবং খাদ্যের গুণগতমান নির্ধারণ করা প্রতিষ্ঠানে চাকরির পথ খুলে দেয়।

কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন কৃষি অর্থনীতি গ্র্যাজুয়েটরা। কৃষি সম্পর্কিত বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের স্বতন্ত্র অর্থনীতি বিভাগ রয়েছে যেখানে কৃষি অর্থনীতির শিক্ষার্থীদের গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। পাশপাশি কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক, বীমা, এনজিও এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং বিভাগে চাকরি করার সুযোগতো আছেই। বর্তমানে বিসিএস এ কৃষি বিপণন নামে নতুন একটি স্বতন্ত্র কারিগরি কোটা চালু হয়েছে যেখানে সাধারণ অর্থনীতি ও কৃষি অর্থনীতির স্নাতকধারীরা আবেদন করার সুযোগ পাবে।

বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ : কৃষি বিষয়গুলোতে পড়তে পারেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি), বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি)।

এছাড়া স্বল্প পরিসরে কৃষিবিষয়ক পাঠক্রম চালু রয়েছে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিমেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ফিশারিজ কলেজ ও ঝিনাইদহ সরকারি ভেটেরিনারি কলেজে।

     More News Of This Category

Our Like Page