ইজিপিতেও থেমে নেই অনিয়ম-দুর্নীতি

 

ফয়সাল হোসেন।

একযুগের বেশি সময় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পূর্ত অধিদপ্তরের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে মাঠপর্যায় থেকে অফিসিয়াল কাজ সম্পন্ন করতেন। মাস শেষে প্রতিষ্ঠানের বেতন দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চলতো।

কিন্তু হঠাৎ তার মাথায় স্বপ্ন জেঁকে বসে স্বল্প সময়ে কোটিপতি হওয়ার। ফলে ধীরে ধীরে নিজেই ঠিকাদারি লাইসেন্স করেন। অনেক আশা বুকে নিয়ে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে গত তিন বছরে ইজিপি টেন্ডারে অংশ নিয়ে ২০ লাখ টাকা খুইয়েছেন।

তার মতে, সরকারের কাজে গতিশীল ও দুর্নীতি বন্ধে ইজিপি পদ্ধতি চালু করলেও সেখানে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। বরং আগে যেসব ঠিকাদার ও কর্মকর্তা টেন্ডারে অনিয়ম করেছেন, তাদের কাছে এটি নতুন কৌশল মাত্র। ইজিপিতে অনিয়ম-দুর্নীতির ব্যাপারে কোনো প্রকৌশলী প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে নারাজ। কারণ তারা মনে করছেন, সরকারের এই নতুন পদ্ধতির অনিয়ম সম্পর্কে কথা বললে তাদের সমস্যা হতে পারে।

জানা গেছে, ইজিপি চালু করতে ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ইজিপি নীতিমালা করা হয়। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন-২০০৬-এর ৬৫ ধারা অনুযায়ী এ নীতিমালা করা হয়। নীতিমালার ভিত্তিতে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রিফর্ম প্রজেক্ট-২ এর অধীনে কেন্দ্রীয় ইজিপি পোর্টাল তৈরি করে সিপিটিইউ। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। দরপত্র আহ্বানে ইজিপি পদ্ধতিতে পুঞ্জীভূত দুর্নীতি নতুনভাবে রূপ নিয়েছে। দ্বিগুণ বেড়েছে দরপত্র জালিয়াতি।

অনলাইনে সরকারি কেনাকাটার (ইজিপি) কার্যক্রম পরিচালনাকারী পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) কোনোভাবেই এই জালিয়াতি রোধ করতে পারছে না। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দেশের অন্যতম বৃহৎ প্রকৌশল সংস্থা।

এই সংস্থার তালিকাভুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাহমিনা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মাদ হানিফ  বলেন, সরকার দুর্নীতি ও আধিপত্য বিস্তার দূর করতে ইজিপি পদ্ধতি চালু করে। কিন্তু বাস্তবে এই পদ্ধতিতে সংস্থার কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ঠিকাদাররা দুর্নীতি করছেন।

প্রধান কার্যলায় থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত প্রতি স্তরেই ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। টেন্ডারবাণিজ্য বন্ধে সরকার ইজিপি পদ্ধতি চালু করলেও বন্ধ হয়নি এই খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৌশলীকে ম্যানেজ করতে না পারলে কাজ পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রাক্কলন মূল্য প্রকৌশলী জানান শুধু তার পছন্দের ঠিকাদারকেই। এ ছাড়াও অনেক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে নিজের আত্মীয় স্বজনকে দিয়ে ঠিকাদারি কাজ করানোরও অভিযোগ আছে।

সিপিটিইউ সূত্রে জানা গেছে, ইজিপি পদ্ধতি চালু হওয়ার পর থেকে এ ব্যবস্থায় সেবাগ্রহীতার সংখ্যা বড়েছে কয়েক গুণ। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে অধিদপ্তরসহ অধিকাংশ উন্নয়ন, সংস্কার ও কেনাকাটা সরকার ইজিপি ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। বর্তমানে ৪৭টি মন্ত্রণালয়, ২৭টি বিভাগ এবং এক হাজার ২৯২টি প্রতিষ্ঠান ইজিপিতে নিবন্ধন করেছে। আর ২০১২ সালের জুনে ছিলো ১৪।

২০১৩ সালের জুনে ৪৯৮, ২০১৪ সালে জুনে আট হাজার ৪৩৬ ও ২০১৫ সালের জুনে ২৬ হাজার ১০২টি ছিলো। এভাবে প্রতিবছর আহ্বানকৃত দরপত্রের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেড়েছে আর্থিক সংশ্লষ্টতা। কিন্তু দরপত্র নিষ্পন্নকালে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট-২০০৬ অনুযায়ী, ঠিকাদারদের কারিগরি ও আর্থিক যোগ্যতা যাচাই করার ক্ষেত্রে চরম শৈথিল্য দেখানো হচ্ছে।

এতে অযোগ্য অনেক প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়ে যাচ্ছে; যা পরবর্তীতে কাজ সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ে কাজই শেষ করতে পারে না। ফলে বেড়ে যায় প্রকল্প ব্যয়। এসব প্রকল্প একদিকে যেমন সরকারকে সমালোচনার মুখোমুখি করছে, অন্যদিকে বৃদ্ধ করছে জনভোগান্তি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দরপত্রে অংশগ্রহণকারী ঠিকাদারের সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় কারিগরি এবং আর্থিক যোগ্যতা আছে কি-না দরপত্র নিষ্পন্নকালে তা যাচাই করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু কর্মকর্তারা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ঠিকাদারের যোগ্যতা আছে কি-না তা যাচাই করছেন না। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ সিপিটিইউ সমপ্রতি একটি পরিপত্র জারি করে।

পরিপত্রে বলা হয়েছে, পিপিএ-২০০৬ এর ৪৮ ধারার অধীন দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি কর্তৃক দরপত্র মূল্যায়ন প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে ধারা ৫০ অনুযায়ী দরপত্র দলিলে উল্লিখিত দরপত্র দাখিলের পর রেসপন্সিভ দরপত্রদাতার কার্যকরভাবে চুক্তি পালনের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও আর্থিক সামর্থ্য আছে কি-না তা যাচাই করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সমপ্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এই বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে না।

এতে আরো বলা হয়, পিপিআর-২০০৮ এর ১০০(১) ধারা মতে, দরপত্র দলিলে উল্লিখিত নির্ণায়ক অনুসরণক্রমে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি দরপত্র দাখিল-উত্তর যোগ্যতা যাচাই করবে।

ধারা-২ মতে, মূল্যায়ন কমিটি প্রয়োজনে দরপত্রদাতা কর্তৃক দরপত্র দলিলে প্রদত্ত ক্রয় কার্যাদি সম্পাদন সম্পর্কিত তার অতীত অভিজ্ঞতার বিবরণ যাচাই করার জন্য এবং সংশ্লিষ্ট দরদাতা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্যাদি সংগ্রহকল্পে সূত্রের সাথে যোগাযোগ করবে।

ধারা-৩ মতে, যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যথাযথ বলে বিবেচিত হলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বিশেষভাবে উচ্চমূল্য বা জটিল কার্যে দরপত্র মূল্যায়নের সময় টেন্ডার দলিলে বর্ণিত তথ্যের সঠিকতা যাচাই করার জন্য দরদাতার কার্যালয় বা ভবন পরিদর্শন করতে পারবে।

৪-এর উপবিধি-৩ মতে, পরিদর্শনে সাধারণভাবে দরপত্রদাতার যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা সংক্রান্ত বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা প্রত্যক্ষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। পরিদর্শনের সময় দরপত্রদাতার সাথে দরপত্রের কোনো বিষয়ে ও তার মূল্যায়ন সম্পর্কে কোনো আলোচনা করা যাবে না।

ধারা ৫ অনুযায়ী দরপত্রদাতা নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয় তাহলে দরপত্রে মূল্যায়িত দরপত্রদাতা সম্পর্কে এবং তা ফলপ্রসূ না হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গ্রহণযোগ্য দরদাতাদের যোগ্যতা অনুরূপভাবে নির্ধারণ করবে।

সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়েল আওতাধীন সংস্থা পূর্তভবনে দুর্নীতির ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে। যার মধ্যে ইজিপি পদ্ধতিতে দুর্নীতির ব্যাপারটি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে গণপূর্ত অধিদপ্তরে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন (এস্টিমেট) থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই রয়েছে ব্যাপক দুর্নীতি।

এসব দুর্নীতির সঙ্গে ঠিকাদার আর কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এটি শুধু গণপূর্ত অধিদপ্তরে নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইজিপিতে টেন্ডার দিতে গিয়ে এমন অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ পায় দুদক। টেন্ডারে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রাক্কলন, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস, দর-কষাকষির নামে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে ঠিকাদার নিয়োগ, বারবার নির্মাণকাজের নকশা পরিবর্তন করে থাকেন।

ইজিপি পদ্ধতিতে অনিয়ম-দুর্নীতি থেমে নেই এরপরও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, চলতি বছরের মধ্যেই সরকারি সব প্রতিষ্ঠানের দরপত্র ইজিপির মাধ্যমে করা হবে। ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতির মাধ্যমে শতভাগ সরকারি কেনাকাটা বাস্তবায়ন হলে দুর্নীতি দূর হবে বলে মনে করেন তিনি।

ইজিপিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ার ব্যাপারে গণপূর্ত ঠিকাদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম আমার সংবাদকে বলেন, অসাধু ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রণ করতে কর্মকর্তারাও সরাসরি সহায়তা করছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তর, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন সব সংস্থার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় যুক্ত সব সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়া দরকার।

তিনি আরও বলেন, প্রকৌশলীদের টাকা দিতে দিতে শেষ, ঘাটে ঘাটে টাকা দিতে হয়। ইজিপি পদ্ধতি যেটা তা তো মানছে না। ইজিপি দিতে হলে সমস্ত টেন্ডার ডকুমেন্ট আপ টু ডেট, ফাইলপত্র, কাগজপত্র আপ টু ডেট কইরা, টেন্ডার কল করবে।

কিন্তু এর (প্রকৌশলীরা) কাজের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রাক্কলন (এস্টিমেট) করতে হবে। কিন্তু সেখানে এসব কাগজপত্র সঠিক করার আগেই প্রকৌশলীরা টেন্ডার কল করেন। টেন্ডার কল করার পর কাগজপত্র প্রোসেসিং করেন।

এতে বাধ্যতামূলক ঠিকাদাররা প্রকৌশলীদের কাছে গিয়ে কাজের জন্য কাগজপত্র স্বাক্ষর করান। যেকোনো কাজের ভাগবাটোয়ারা পেতে এই কৌশল অবলম্বন করেন প্রকৌশলীরা। অফিসের পিয়ন থেকে শুরু করে দায়িত্বরত প্রকৌশলীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরাঘুরি করে কাজের এস্টিমেট অনুমোদন করাতে হয়।

অথচ ইজিপির নিয়ম— এস্টিমেট শতভাগ সম্পন্ন হওয়ার পর টেন্ডার কল করলে ঠিকাদাররা অংশগ্রহণ করবেন। সেখানে টেন্ডার পাওয়ার পর ওয়ার্ক অর্ডার আনতে অফিসে যাবেন ঠিকাদাররা। কিন্তু ইজিপির এই নিয়ম কোথাও মানছে না।

এছাড়া কাজের ২ থেকে ৩ শতাংশ অর্থ ইঞ্জিনিয়াররা নেন। আর বড় কাজগুলোর ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৬ শতাংশ অর্থও নেন তারা। আর ঠিকাদাররা বিল তুলতে গেলে প্রকৌশলীদের টাকা দিতেই হবে। টাকা না পেলে বিলে স্বাক্ষর করেন না। প্রকৌশলীরা ভাবেন, এটি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি।

 

সুত্র : আমারসংবাদ

     More News Of This Category

Our Like Page