একজন আমির হোসেন অর্ধশত কৃষিযন্ত্রের উদ্ভাবক

আমাদের প্রকৌশল ডেস্ক ।।

প্রায় অর্ধশত কৃষিযন্ত্রের উদ্ভাবন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন আমির হোসেন। ১৯৭৬ সাল থেকে লায়নার পিষ্টন কৃষি যন্ত্রাংশের পাশাপাশি পানি তোলার জন্য সেন্ট্রিফিউগাল পাম্প তৈরি করে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক চমক সৃষ্টি করেন বগুড়ার আমির হোসেন।


তাঁর হাত ধরে বগুড়ায় ঘুরে যায় কৃষি যন্ত্রপাতি ও হালকা প্রকৌশল শিল্প। ক্রমে এর অভাবনীয় বিপ্লব গড়ে উঠেছে। এখন এক হাজার ৫০০ কলকারখানায় বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি কৃষি যন্ত্রাংশ এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের বাজার তৈরি হয়েছে।

আমির হোসেন এখন পর্যন্ত অর্ধশত কৃষি যন্ত্র তৈরি করেছেন। এসব যন্ত্র উদ্ভাবনের জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তাঁকে ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিগ্রি প্রদান করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। এ ছাড়া ২০০৮ ও ২০১১ সালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পদক অর্জন করেন এবং যন্ত্রবিজ্ঞানী খেতাব পান।

দিন দিন আমির হোসেন কৃষকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় মুখ এবং একজন সফল কৃষিবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তিনিও কৃষকের অবস্থা দেখে উপলব্ধি করেন, সংগঠিত উদ্যোগ ও কৃষি যন্ত্রের আধুনিকায়ন ছাড়া এ দেশের কৃষিকাজের ও কৃষকের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

আমির হোসেন জানান, গ্রামের অতি সাধারণ কৃষক ও নারী কৃষকের কাছ থেকে তাদের সনাতন পদ্ধতিতে কৃষিকাজ করার দুঃখকষ্ট ও সময় অপচয়ের কথা শোনেন। ভাবেন এই কাজগুলো যদি যন্ত্রের মাধ্যমে করা যেত, অনেক কষ্ট কমে যেত। এরপর তিনি তাঁর অভিজ্ঞতাকে বিজ্ঞানে রূপান্তর করে উন্নত দেশীয় প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বিভিন্ন কৃষি যন্ত্র তৈরি করেন। এখন এসবই ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশের কৃষকের হাতে।

আমির হোসেন বলেন, ‘আমাদের কৃষককে সকাল-সন্ধ্যা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলাতে হয়। কৃষকের অমানুষিক কষ্ট লাঘবের জন্য কৃষি যান্ত্রিকীকরণ  অপরিহার্য ছিল। অন্যদিকে কৃষির উত্পাদনশীলতা ও উত্পাদন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্যও কৃষির যান্ত্রিকীকরণ প্রয়োজন।

কিন্তু বর্তমানে আমদানিনির্ভর যন্ত্রপাতি দিয়ে যেভাবে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ  হচ্ছে, তা কৃষির উত্পাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা প্রান্তিক ভূমিহীন কৃষকের বহনক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে উদ্বৃত্ত শ্রমিকের এ দেশে কর্মসংস্থান হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। এসব যন্ত্রপাতি আমদানি করতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও ব্যয় হচ্ছে।

আমির হোসেনের মতে, বাংলাদেশে কৃষির যান্ত্রিকীকরণের জন্য প্রয়োজন দেশীয় উপকরণ নির্ভর, সব শ্রেণির কৃষকের জন্য সহজলভ্য, ব্যয় সাশ্রয়ী ও লাগসই যন্ত্রপাতি। এমন কৃষি যন্ত্রপাতি, যা আমাদের দেশের উত্পাদিত যন্ত্রাংশ দিয়ে দেশেই উত্পাদন করা সম্ভব। এটা বাস্তবে প্রমাণ করেছেন প্রতিভাবান স্বশিক্ষিত প্রকৌশলী আমির হোসেন। তাঁর উদ্ভাবিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আজ সারা দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি এখন পর্যন্ত বহু ধরনের কৃষি ও পরিবেশসম্মত যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় ভুট্টা মাড়াই মেশিন, ভুট্টা ভাঙা মেশিন, ধান মাড়াই অটোমেশিন, আলু প্রেডিং মেশিন, বীজ বপন যন্ত্র, নিড়ানি যন্ত্র, শস্য ঝাড়াই যন্ত্র, ফিশ ফিড ও পোল্ট্রি ফিড তৈরির যন্ত্র, গরু-ছাগলের সুষম খাদ্য তৈরির যন্ত্র, টোপা মরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ধান, হলুদ, আলু শুকানোর প্রসেসিং সেমি অটোমেশিন, গুঁটি ইউরিয়া তৈরির যন্ত্র ও সেমাই তৈরির মেশিন।

অন্যদিকে মাটির উর্বরতা রক্ষার চিন্তা থেকেই তিনি উদ্ভাবন করেছেন জৈব সার তৈরির মেশিন, যা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে তিনি মিনি সোলার প্যানেলের সেচযন্ত্র চালানোর প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গবেষণা করছেন। তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশ একদিন কৃষিসহ হালকা ও মাঝারি যন্ত্রপাতিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।

     More News Of This Category

Our Like Page